অনুসন্ধান

উল্লেখিত পোস্টটি মূলত সারা বিশ্বব্যাপী ইংরেজি ভাষায় ছড়ানো একটি ওয়াটসাপ ম্যাসেজের বঙ্গানুবাদ। এই পোস্ট ইউনিসেফ হতে প্রদত্ত না।[9] এই পোস্টের দাবীগুলো হচ্ছে—

  • ১. করোনাভাইরাস মোটামুটি বড়সড় একটি ভাইরাস। (অসত্য)
  • ২. বাজারের যেকোনো মাস্ক এই ভাইরাস প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে। (অসত্য)
  • ৩. ভাইরাসটি মাটিতে অবস্থান করে, তাই এটি বাতাসে ছড়ায় না। (অর্ধসত্য)
  • ৪. কোন ধাতব তলে বা বস্তুতে করোনা পড়লে প্রায় ১২ ঘণ্টা জীবিত থাকতে পারে। (অপ্রমাণিত)
  • ৫. কাপড়ে এই ভাইরাসটি প্রায় ৯ ঘণ্টা জীবিত থাকতে পারে। (অপ্রমাণিত)
  • ৬. কাপড় ধুয়ে নিলে বা রোদে ২ ঘণ্টা থাকলে এটি মারা যাবে। (অপ্রমাণিত)
  • ৭. হাতে বা ত্বকে এই ভাইরাসটি ১০ মিনিটের মতো জীবিত থাকতে পারে। (অপ্রমাণিত)
  • ৮. করোনা গরম আবহাওয়ায় বাঁচে না। (অপ্রমাণিত)
  • ৯. ৭০ সেলসিয়াস তাপমাত্রা এটিকে মারতে পারে। (বিভ্রান্তিকর)
  • ১০. বেশি বেশি গরম পানি পান করে এটি রোধ করা যায়। (অপ্রমাণিত ও বিপদজনক)
  • ১১. লবণ মিশ্রিত গরম পানি দিয়ে গারগল করে টনসিলের জীবাণু ও করোনা রোধ করা যায়। (অপ্রমাণিত ও বিভ্রান্তিকর)
  • ১২. আইসক্রিম খেলে এই রোগের সংক্রামণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। (অপ্রমাণিত)
  • ১৩. নাকে-মুখে আঙ্গুল বা হাত দেবার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। (সত্য)

করোনা মোটামুটি বড়সড় একটি ভাইরাস। তবুও খালি চোখে দেখা যাবে না, ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপ লাগবে এটাকে দেখতে!

তথ্যটি: বিভ্রান্তিকর

ভাইরাসের সাধারণ ব্যাস ২০-৩০০ ন্যানোমিটার হয়। আর নতুন করোনাভাইরাসের (SARS-CoV-2) ব্যাস হয়ে থাকে প্রায় ৫০-২০০ ন্যানোমিটার।[4] তবে এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত আয়তনে সবচেয়ে বড় ভাইরাস হচ্ছে প্যানডোরা ভাইরাস। যার ব্যাস প্রায় ১,০০০ ন্যানোমিটার (১ মিটারের ১ লাখ ভাগের ১ ভাগ)। তাই করোনাভাইরাস তুলনামূলকভাবে খুব বড়সড় নয়।

স্বাভাবিকভাবে মানুষ খালি চোখে সর্বনিম্ন ০.১ মিলিমিটার (১ মিটারের ১,০০০ ভাগ) ব্যাসের কণিকা দেখতে পারে। তাই কোন ভাইরাসই খালি চোখে দেখা যায় না।

এর আকারের কারণে বাজারে পাওয়া যায় এমন মাস্ক এটাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে।

তথ্যটি: অসত্য

এই ভাইরাস বাতাসে ভাসতে পারে না বরং মানুষের সর্দি, থুতু বা কফের ছিটের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই এটি প্রতিরোধে মাস্ক খুব একটি কার্যকর না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিস কন্ট্রোল ও প্রিভেনশন, শুধুমাত্র অসুস্থ ব্যক্তি (যাদের জ্বর, সর্দি, কাশি ইত্যাদি আছে তাদের) এবং তাদের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের মাস্ক পড়ার পরামর্শ দেয়, যাতে করে অসুস্থ ব্যক্তি হতে জীবাণু না ছড়াতে পারে।

বাংলাদেশের বাজারে সবচেয়ে প্রচলিত হচ্ছে সার্জিক্যাল মাস্ক ও N95 মাস্ক। সার্জিক্যাল মাস্ক ঢিলেঢালা হয়, যা আমাদের বড় কণিকা যেমন, পানির ফোটা, বালি নাকে ও মুখে সরাসরি পৌছাতে একপ্রকার বাঁধা সৃষ্টি করে। কিন্তু ক্ষুদ্র কণিকা ফিল্টারে এটি তেমন কার্যকরী না।

এন৯৫ মাস্ক সর্বোচ্চ ৩০০ ন্যানোমিটার ব্যাসের কণিকা ফিল্টার করতে পারে। অন্য আরেক ধরণের এন৯৫ মাস্ক (N95 FFRs) প্রায় সব রকম ব্যক্টেরিয়া ও ভাইরাস প্রতিরোধ করতে পারে।[5] সেটিও যথাযথ ফিট টেস্ট ও সঠিক নিয়মে পড়া ও খোলা সাপেক্ষে। কিন্তু এমন মাস্ক সাধারণত বাজারে পাওয়া যায় না। রাস্তায় যেসকল মাস্ক বিক্রয় হয় সেটির মানের কোন নিশ্চয়তা পাওয়া কঠিন।

তাই বাজারে পাওয়া যায় এমন সব মাস্কই এই ভাইরাস প্রতিরোধ করতে সক্ষম না। তবে মাস্ক নাকে ও মুখে কোন প্রকার কণিকা সরাসরি প্রবেশে বাঁধা সৃষ্টি করে বলে, খুব সামান্য হলেও এসব এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কমাতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে ব্যবহৃত মাস্ক, হাঁচি বা কাশিতে ভিজে গেলে তা পুনরায় ব্যবহার করা নিরাপদ না। উপরন্তু মাস্কের চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে নকল ও অকার্যকরী মাস্কেরও প্রাদুর্ভাব বেড়েছে এবং বিক্রয় হচ্ছে চড়া দামে। এর ফলে রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীরা, যাদের মাস্ক সবচেয়ে বেশী দরকার, তারা মাস্ক পাচ্ছে না।

যেহেতু এই ভাইরাসটি বাতাসে নয়, মাটিতে অবস্থান করে, তাই এটা বাতাসে ছড়ায় না।

তথ্যটি: অর্ধসত্য

এই ভাইরাস উন্মুক্ত বাতাসে ভেসে থাকতে পারে না বলে, এটি সরাসরি বাতাসে ছড়াতে পারে না। মানবদেহের বাইরে এই ভাইরাস সর্দি, থুতু বা কফ ইত্যাদির ছিটের মাধ্যমে ছড়ায় ছড়ায় এবং এসবের সংস্পর্শে সুস্থ ব্যক্তির মাঝে সংক্রামিত হয়। যেহেতু এসব বাতাসে ভেসে থাকে না, তাই এই ভাইরাসও বাতাসে ভেসে থাকতে পারে না এবং নিচে পতিত হয়। [8]

তবে এটি সুনির্দিষ্টভাবে মাটিতে অবস্থান না করলেও, হাঁচি বা কাশির সময় এটি আশেপাশে ছড়িয়ে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাই, অসুস্থ ব্যক্তি, যাদের সর্দি, কাশি বা ঠাণ্ডা আছে, তাদের হতে নূন্যতম ৩ ফিট দূরত্বে থাকতে পরামর্শ দেয়।

কোন ধাতব তলে বা বস্তুতে করোনা পড়লে প্রায় ১২ ঘণ্টা জীবিত থাকতে পারে। কাপড়ে এই ভাইরাসটি প্রায় ৯ ঘণ্টা জীবিত থাকতে পারে। তাই, কাপড় ধুয়ে নিলে বা রোদে ২ ঘণ্টা থাকলে এটি মারা যাবে। হাতে বা ত্বকে এই ভাইরাসটি ১০ মিনিটের মতো জীবিত থাকতে পারে।

তথ্যটি: অপ্রমাণিত

করোনাভাইরাস কোন তল বা পৃষ্ঠে কতদিন বাঁচে সেটি এখনও সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে অন্য যেকোনো ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মত এটিও তাপমাত্রার প্রতি সংবেদনশীল। মানুষকে যে করোনাভাইরাস আক্রান্ত করে তা স্বাভাবিক রুমের তাপমাত্রায় কোন স্থির তলের উপর ৯ দিন পর্যন্ত সংক্রামনশীল থাকতে পারে। আবার ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তা ২৮ দিন পর্যন্তও টিকতে পারে। অন্যদিকে ৩০°সেলসিয়াস তাপমাত্রা এই ভাইরাসে স্থিতি সময়কাল কিছুটা কমে যায়।[2]

তাই, জীবাণুনাশক দ্রব্য ব্যবহার ছাড়া, বস্তুভেদে কোন পৃষ্ঠ বা ত্বকের উপর এটি সময়ের উপর নির্ভর করে মারা যায় এমন কিছু এখনো প্রমাণিত নয়।

করোনা গরম আবহাওয়ায় বাঁচে না।

তথ্যটি: অসত্য

পূর্বের করোনাভাইরাস ও ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসগুলোর বৈশিষ্ট্য থেকে ধারণা করে এই দাবীটি করা। এসব ভাইরাসের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে যে গ্রীষ্মকাল আসতে থাকলে এদের প্রাদূর্ভাবও কমে যায়। নতুন করোনাভাইরাসের ব্যাপারে এখনো বিজ্ঞানীরা কম জানে এবং বৈশিষ্টের দিক থেকেও এটি পূর্বের করোনাভাইরাসগুলো হতে কিছুটা ভিন্ন। যেমন, এটির মারাত্মকতা কম কিন্তু এটি সংক্রামক বেশী।

এছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোসহ গরম আবহাওয়া সম্পন্ন অন্যান্য দেশেও এটি উল্লেখযোগ্য হারে ছড়ানোর খবর পাওয়া গিয়েছে। মালয়েশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের মার্চ ২৪ তারিখের তাপমাত্রা ছিলো ২৮-৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ততদিনে দেশটিতে করোনাভাইরাসে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১,১৮৩ তে দাঁড়িয়েছে এবং মৃতের সংখ্যা ৯ জন। শুধুমাত্র এর পূর্বের ৭ দিনে নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ৭৫৫ জন। [7][10]

৭০ সেলসিয়াস তাপমাত্রা এটিকে মারতে পারে। কাজেই, ভাল না লাগলেও এখন বেশি বেশি গরম পানি পান করবেন, আইসক্রিম থেকে দূরত্ব বজায় রাখবেন।

তথ্যটি: অসত্য ও বিপদজনক

প্রয়োজনে ৪০-৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার উষ্ণ পানি মানুষ পান করতে পারে। তবে এর বেশী বা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পানি ঠোট, জিহ্বা ও মুখের ভিতরে পুড়িয়ে ফেলতে পারে। ঘনঘন গরম পানি খাওয়া শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য বিপদজনক। এছাড়াও গরম পানি দিয়ে ভাইরাস এইভাবে মারা যায় না। এটি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও অপ্রমাণিত চিকিৎসা পদ্ধতি। [6]

করোনাভাইরাসে (যা শ্বাসযন্ত্রে আক্রমণ করে সেটিতে) আক্রান্ত হলে, জ্বর, সর্দি বা কাশির জন্য, ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী যেসকল জিনিস এড়িয়ে চলতে বলা হয়, সেসব অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে। কিন্তু সুস্থ ব্যক্তির জন্য এই পরামর্শ কোন স্বাস্থ্য সংস্থা হতে দেওয়া হয়নি।

লবণ মিশ্রিত গরম পানি দিয়ে গারগল করলে গলার মিউকাস পরিষ্কার হবার সাথে সাথে টনসিলের জীবাণুসহ করোনাও দূর হবে, ফুসফুসে সংক্রমিত হবে না।

তথ্যটি: অপ্রমাণিত ও বিভ্রান্তিকর

মিউকাস শ্বাসযন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অতিরিক্ত মিউকাস উৎপাদন (যেটিকে আমরা সর্দি বলি) ঠাণ্ডা, ইনফ্লুয়েঞ্জা (কোন কোন ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসে) আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ। গরম পানি দিয়ে কুলি করলে যেমন আমাদের সর্দি চলে যায় না এবং টনসিলে কোন জীবাণুর সংক্রামণে যেমনি গারগলের মাধ্যমেই চিকিৎসা করা যায় না, তেমনি এর মাধ্যমে করোনাভাইরাসও দূর করা যায় না। কোন স্বাস্থ্য সংস্থা হতে এমন চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হয়নি।

নাকে-মুখে আঙ্গুল বা হাত দেবার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ, মানব শরীরে জীবাণু প্রবেশের সদর দরজা হলো নাক-মুখ-চোখ!

তথ্যটি: সত্য

করোনাভাইরাস সংক্রামণ রোধে নাক, মুখ ও চোখে অপরিষ্কার অবস্থায় হাত দেওয়া পরিহার করতে হবে। কারণ এসব পথ দিয়ে এই ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই কারণেই সাবান-পানি বা জীবাণুনাশক দিয়ে হাত ধুতে পরামর্শ দেয়। [3]

 

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে যা করবেন:

করোনাভাইরাস বিষয়ক অপতথ্য ঠেকাতে ও জনসাধারণকে সচেতন করতে আমাদের গ্রুপে যোগ দিন। 

সতর্কতা: যেকোন ওয়েবসাইট বা নিউজপোর্টালের তথ্য বিশ্বাস না করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র মত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইট থেকে তথ্য জানুন। নতুন করোনাভাইরাস বিষয়ক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র পোর্টালের ঠিকানা: www.who.int/emergencies/diseases/novel-coronavirus-2019। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি’র ওয়েবসাইটের ঠিকানা: https://www.cdc.gov/coronavirus/2019-ncov/index.html

পাদটীকা

মন্তব্য

আমাদের ফেসবুকগ্রুপে আলোচনায় যুক্ত হোন।: www.facebook.com/groups/jaachai