অনুসন্ধান

নতুন করোনাভাইরাস রোগ (COVID-19) সম্পর্কে কিছু সতর্কীকরণ তথ্য পোস্ট আকারে ফেসবুকে প্রচারিত হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে মূলত ভারত থেকে বাংলায় এই পোস্টের উৎপত্তি হয়, যা এখন বাংলাদেশে কপি-পেস্ট করে প্রচার করা হচ্ছে। বার্তাটি করোনাভাইরাস সম্পর্কে সতর্কীকরণ তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি বলা হয়, “চীন সর্বদা ভারতের ক্ষতি চায় বলেই এই মরণব্যাধি ভারতের ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা চালাচ্ছে।” আমরা এই বার্তায় প্রচারিত তথ্যের দাবীগুলোর সত্যতা তুলে ধরলাম।

১. নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে, মুরগির মাংস, সামুদ্রিক মাছ, পশুর মাংস থেকে কঠোরভাবে দূরে থাকুন।

তথ্যটি: অসত্য

মাছ-মুরগি-মাংস খাওয়া হতে বিরত থাকতে হবে এই মর্মে কোন পরামর্শ কোন গণস্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে দেওয়া হয়নি। পূর্বের একপ্রকার করোনাভাইরাস উট থেকে সংক্রামিত হলেও, নতুন এই ভাইরাস গবাদি পশু কিংবা সামুদ্রিক মাছ থেকে সংক্রামিত হয় এমন কোন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তির সর্দি, কফ ও থুতুর মাধ্যমে এটি অপর ব্যক্তির মাঝে সংক্রমিত হয়। [1][2]

২. গুরুতর ঠাণ্ডা, হাঁচি, শ্বাসকষ্টের সমস্যা, শ্বাস নিতে অসুবিধা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হবার সাধারণ লক্ষণ।

তথ্যটি: সত্য।

এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ২-১৪ দিনের মধ্যে জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট উপসর্গ হিসেবে পরিলক্ষিত হবে।[3]

৩. ফুটন্ত জল পান করুন। চা এর মতো চুমুক দিয়ে গরম জল পান করুন।

তথ্যটি: অপ্রমাণিত ও বিপদজনক

জীবাণু ধ্বংসের জন্য ফুটন্ত পানি ঠাণ্ডা না করে সরাসরি পান করা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়াও অস্বাভাবিক তাপমাত্রার (গরম কিংবা ঠাণ্ডা) পানি সবসময় পান করা শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়। পানি খেয়ে কিংবা গরম পানি দিয়ে এইভাবে ভাইরাস রোধ করা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক।

৪. আমিষ খাবার বন্ধ করুন। রেস্তরাঁয় খাওয়া দেওয়া ও ফুটপাতের খাবার থেকে কিছুদিন বিরত থাকুন।

তথ্যটি: অসত্য

আমিষজাত খাবার থেকে এই ভাইরাস সংক্রামিত হয় এমন কোন প্রমাণ নেই। তবে যে কোন খাবারই যথাযথ পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত পদ্ধতিতে রান্না করা প্রয়োজন। বিশেষত অসুস্থ ব্যক্তির (যাদের এই রোগের উপসর্গ রয়েছে এমন ব্যক্তি) দ্বারা খাবার তৈরি সংক্রামণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করবে। এছাড়াও যে পাত্রে ও স্থানে খাবার পরিবেশন করা হবে সেটিও নিরাপদ হওয়া জরুরি।[1]

৫. প্রতিরোধের জন্য ভিটামিন সি, জিঙ্ক, বি কমপ্লেক্স প্রতিদিন সেবন করুন।

তথ্যটি: অপ্রমাণিত

ভিটামিন ঘাটতির ফলে এই ভাইরাসে সংক্রামণ বেশী ঘটে এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া ও পরিচ্ছন্ন জীবাণুমুক্ত পরিবেশে থাকা এই সময় একান্তভাবে প্রয়োজন।

৬. কঠোরভাবে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করুন।

তথ্যটি: সত্য

মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য উভয়ের প্রতিই যত্নশীল হওয়ার প্রয়োজন এই সময়। বিশেষত বয়ষ্ক ও যাদের বিশেষ স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে (হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসজনিত সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ) তাদের স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে অতিরিক্ত যত্নশীল হতে হবে।[4]

৭. গরম জলে তুলসী, আদা, গোলমরিচ, দারুচিনি ফুটিয়ে চায়ের মতো পান করুন। গরম গরম সবজির সুপ পান করুন।

তথ্যটি: অপ্রমাণিত

এমন কোন উপাদান গ্রহণে এই ভাইরাস প্রতিরোধ করা যাবে এই মর্মে কোন পরামর্শ কোন গণস্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেয়নি। তবে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা হিসেবে, উপসর্গগুলো (যেমন, জ্বর, সর্দি, কাশি) এর চিকিৎসা প্রদান করতে হবে হবে। যা ঘরে বিচ্ছিন্ন ও সতর্ক পরিবেশে রোগীকে রেখে প্রদান করা সম্ভব।

৮. বিদেশী পর্যটক পাশে গেলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করুন।

তথ্যটি: অপ্রমাণিত

বিদেশী পর্যটক হলেই তিনি এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত এমন ধারণা যেমন সঠিক নয়, তেমনি স্বদেশী ব্যক্তি হলে তার করোনাভাইরাস থাকার সম্ভাবনা নেই এমন বিশ্বাস করাও অযৌক্তিক। গণস্বাস্থ্য অধিদপ্তরগুলো সুস্থ (যাদের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার উপসর্গ নেই এমন) ব্যক্তিদের মাস্ক পরতে পরামর্শ প্রদান করে না। তবে এই সময় যে কোন ব্যক্তির সাথে করমর্দন ও কোলাকোলি করা এমন (অনাবশ্যক) সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। এবং অবশ্যই এমন সংস্পর্শে আসলে জীবাণুনাশক বা সাবান-পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে।[5]

৯. বন্দর ও বিমানবন্দরে কর্মরত ব্যক্তি বর্গ অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করুন

তথ্যটি: সত্য

যেহেতু বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ স্থলবন্দর, বাস স্ট্যান্ড, রেল স্টেশন ও বিমানবন্দরে আসে তাই অবশ্যই এসব গণ সমাবেশের স্থানে কর্মরত ব্যক্তিদের অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। প্রয়োজনে সবসময় মাস্ক ও জীবাণুনাশক (যেমন, হ্যান্ড সেনিটাইজার) সাথে রাখতে হবে।[6]

১০. জ্বর, সর্দি তে অ্যান্টিবায়োটিকগুলি কাজ না করলে সঙ্গে সঙ্গে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

তথ্যটি: বিভ্রান্তিকর।

কোন প্রকার এন্টিবায়োটিক ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া খাওয়া উচিৎ নয়। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার উপসর্গগুলো (যেমন, জ্বর, সর্দি, কাশি) পরিলক্ষিত হলে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। রোগীকে অবশ্যই বিচ্ছিন্ন পরিবেশে রেখে সেবা প্রদান করতে হবে। রোগীকে ও রোগীর সেবা প্রদানকারীকে অবশ্যই সর্বদা মাস্ক ব্যবহার করতে হবে ও হাত জীবাণুনাশক দিয়ে  ঘনঘন পরিষ্কার করতে হবে। সেবা প্রদান করার উদ্দেশ্য ছাড়া রোগীর নিকটবর্তী হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

এক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ না করলেও, ডাক্তার কোন কোন সময় ক্ষতিকর ব্যক্টিরিয়ার সংক্রমণ রোধে এন্টিবায়োটিক পরামর্শ দিতেও পারেন। নিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্ট পরিলক্ষিত হলে দ্রুততার সাথে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।[7]

 

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে যা করবেন:

করোনাভাইরাসের ব্যাপারে অপতথ্য ঠেকাতে ও জনসাধারণকে সচেতন করতে আমাদের গ্রুপে যোগ দিন। 

সতর্কতা: যেকোন ওয়েবসাইট বা নিউজপোর্টালের তথ্য বিশ্বাস না করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র মত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইট থেকে তথ্য জানুন। নতুন করোনাভাইরাস বিষয়ক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র পোর্টালের ঠিকানা: www.who.int/emergencies/diseases/novel-coronavirus-2019। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি’র ওয়েবসাইটের ঠিকানা: https://www.cdc.gov/coronavirus/2019-ncov/index.html

পাদটীকা

তথ্যসূত্র

  1. "How COVID-19 Spreads". Centers for Disease Control and Prevention.
  2. "COVID-19: Frequently Asked Questions and Answers". Centers for Disease Control and Prevention.
  3. "COVID-19: Symptoms". Centers for Disease Control and Prevention.
  4. "People at Higher Risk for COVID-19 Complications". Centers for Disease Control and Prevention.
  5. "COVID-19: Stigma and Resilience". Centers for Disease Control and Prevention.
  6. "COVID-19: Prevention & Treatment". Centers for Disease Control and Prevention.
  7. "Prevent the spread of COVID-19 if you are sick". Centers for Disease Control and Prevention.

মন্তব্য

আমাদের ফেসবুকগ্রুপে আলোচনায় যুক্ত হোন।: www.facebook.com/groups/jaachai