অনুসন্ধান

সম্প্রতি মা দিবসে বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনয় শিল্পী চঞ্চল চৌধুরীর একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরণের আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পোস্টটিতে চঞ্চল চৌধুরী তার জন্মদাতা মায়ের সাথে একটি ছবি নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক একাউন্ট থেকে প্রোফাইল পিকচার হিসেবে আপলোড করেন।

মে ৯, ২০২১, রবিবার, তার প্রোফাইল পিকচারে তার মায়ের মাথার সিঁদুরকে লক্ষ্য করে কিছু সংখ্যক ব্যক্তি অসংবেদনশীল ভাবে তার ব্যক্তিগত ধর্ম নিয়ে মন্তব্য করা শুরু করে। কেউ কেউ তাকে ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্যও আহ্বান জানায়। মা দিবসে নিজের মাকে স্মরণ করে করা এই পোস্টে তার ব্যক্তিগত ধর্ম নিয়ে করা এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও অসংবেদনশীল কৌতূহল প্রকাশ বিতর্কের সৃষ্টি করে।

আমরা এই বিতর্কের আলোচনা-সমালোচনা নয় বরং দৃষ্টিপাত করতে চাই এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সংবাদ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়ার উপর। স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘটা এমন একটি বিতর্ক নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ইতিমধ্যে সংবাদ পরিবেশ করেছে।

বিডিনিউজ২৪’ তাদের সংবাদে লিখে (বাংলা অনুবাদ),[1]

“তিনি (চঞ্চল চৌধুরী) মা দিবসে তার মা, শর্মিলা চৌধুরী, যিনি নিজেও একজন অভিনেতা, তার একটি ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করে।

“বাংলা নাটকে টাকা বাঁচাতে মা চরিত্রগুলো হারিয়ে যাওয়া নিয়েও তিনি পোস্টটিতে প্রতিবাদ করেন।

“তার ভক্তরা তার ও তার মায়ের মঙ্গল কামনা করেন। কিন্তু শর্মিলা হিন্দু হওয়ায় তাকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করে ধর্মীয় উগ্ররা। চঞ্চলকেও টার্গেট করা হয়।”

অপরদিকে ‘ঢাকা ট্রিবিউন’ চঞ্চলের করা ছবিটি তাদের সংবাদে প্রকাশ করে সেটির নিচে ক্যাপশন দেয় (বাংলা অনুবাদ),[2]

“‘আয়নাবাজি’ অভিনেতা তার মা, শর্মিলা চৌধুরীর সাথে একটি ছবি মা দিবসে পোস্ট করে।”

উল্লেখ্য, উপরের এই সংবাদ দুটিতে ‘শর্মিলা’ বলা হলেও, চঞ্চল চৌধুরীর মায়ের নাম নোমিতা চৌধুরী। এছাড়াও ‘বিডিনিউজ২৪’ মা চরিত্রগুলো হারিয়ে যাওয়া নিয়ে যে পোস্টের কথা উল্লেখ করেছে, তা সম্পূর্ণ অপর একটি পোস্ট, যা মা দিবসের একদিন আগে চঞ্চল চৌধুরী পোস্ট করেন।

মে ৮ তারিখে করা চঞ্চলের অপর ঐ পোস্টটিতে বাংলা নাটকে হারিয়ে যাওয়া মা চরিত্রগুলো ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়। পরিশেষে মা চরিত্রে অভিনয় করার জন্য সুপরিচিত অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী শর্মিলী আহমেদের সেদিন জন্মদিন হওয়ায় তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান তিনি।

ধারণা করা যায়, এই ‘শর্মিলা চৌধুরী’ এর সৃষ্টি এই দুটি পোস্টের সংমিশ্রণে ঘটেছে।

অপরদিকে বিবিসি নিউজ বাংলা-এ উল্লেখ করা হয়,[3]

“আলোচনা হচ্ছে অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে। কারণ ছবিতে তার মাকে দেখা যাচ্ছে মাথায় সিঁদুর, হাতে শাঁখা-পলা পরা।”

অথচ আলোচিত ঐ ছবিতে চঞ্চল চৌধুরীর মায়ের শাঁখা-পলা তো দূরের কথা হাতই দেখা যাচ্ছে না। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে এমন বাঁধাধরা চিন্তা ও ভাষা নিজেই একধরণের সাম্প্রদায়িক আচরণের উদাহরণ।

আলোচ্য ভুলগুলো প্রাথমিকভাবে কিছুটা লঘু ও নিষ্পাপ প্রকৃতির মনে হলেও এই ভুলগুলো চরম অদায়িত্বশীল সাংবাদিকতার নির্দেশক। বিশেষত সাম্প্রদায়িক আচরণের মতো একটি সংবেদনশীল বিষয়ে এমন উদাসীনতা সম্পূর্নভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত। ঠিক যেমন অনাকাঙ্ক্ষিত ছিলো একজন ব্যক্তির মাকে নিয়ে পোস্ট করা একটি ছবিতে তার ধর্ম নিয়ে অযাচিত মন্তব্য করা।

সংবাদ মাধ্যম হচ্ছে জাতির বিবেক। যেখানে নূন্যতম সাংবাদিক শিষ্টাচারই যখন অনুপস্থিত, সেখানে অযাচিত মন্তব্য করা দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অসংবেদনশীল জনগণ সৃষ্টি হওয়াটা হয়তো খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।

পাদটীকা

মন্তব্য

আমাদের ফেসবুকগ্রুপে আলোচনায় যুক্ত হোন।: www.facebook.com/groups/jaachai